— শাহীন ফকির
আগামী ১৯ জুন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্ট ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আমিনুল ইসলামের জন্মদিন। শিল্প-সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং মানবাধিকার ও সমাজ বিশ্লেষণে তিনি এক পরিচিত মুখ। তবে এতসব পরিচয়ের ভিড়ে নিজেকে একজন সাধারণ ‘কলম শ্রমিক’ হিসেবে পরিচয় দিতেই সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এই গুণী মানুষটি। জীবনের বাঁকে বাঁকে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি আজ সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
আমিনুল ইসলাম পিরোজপুর জেলার সদর উপজেলার কুমিরমারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তিনি সমাজ সেবক মোস্তফা কামাল ও নাসিমা আক্তারের জেষ্ঠ সন্তান।
আমিনুল ইসলামের সৃষ্টিশীলতার শুরুটা হয়েছিল স্কুল জীবন থেকেই। ২০০১ সালে নবম শ্রেণীতে পড়াকালীন তিনি তাঁর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ও বিশিষ্ট নাট্যকার দীপঙ্কর চক্রবর্তীকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন "বর্ণমালা থিয়েটার"। তৎকালীন সময়ে গ্রাম থেকে মফস্বল ও টাউনে সাধারণ মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত মঞ্চ নাটক ও যাত্রাপালা। আমিনুলের রচিত ‘নমিনেশন’ নাটকটি ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ হুলারহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিশাল মাঠে মঞ্চস্থ হয়ে দারুণ সাড়া জাগায়। পরবর্তীতে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ও নির্দেশনায় ‘রইজ উদ্দিনের ৭১’, ‘দেশভাগ ও নাসিমা’, ‘আজ আমরা স্বাধীন’, ‘গ্লানিমুক্ত বাংলাদেশ’ এবং ‘চারগেরিলা’ সহ অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক মঞ্চস্থ হয়, যা সমাজকে আলোর পথ দেখাতে সাহায্য করে।
মফস্বলের গণ্ডি পেরিয়ে একসময় ঢাকায় আসেন আমিনুল। যুক্ত হন ঐতিহ্যবাহী 'নাগরিক থিয়েটার'-এ। সেখানে বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ড. এনামুল হকের সান্নিধ্যে ও হাত ধরে শুরু হয় তাঁর জীবনের নতুন একটি অধ্যায়। চলচ্চিত্র ও লেখালেখির জগতে তাঁর অভিষেক ঘটেছিল কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাহিত্যিক আমজাদ হোসেনের হাত ধরে। ২০০৬ সালে অমর প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস "এখনো হৃদয় কাঁদে"। প্রখ্যাত নাট্যকার সেলিম আল দীনকে উৎসর্গ করা এই উপন্যাসটি বাংলা থিয়েটার সাহিত্যে এক অনন্য সংযোজন। থিয়েটার বা নাটকের সাথে সম্পৃক্ত মানুষদের অভিনয় জীবনের বাইরের বাস্তব রূপ, তাদের আবেগ, অনুভূতি, দুঃখ-কষ্ট ও জীবন্ত প্রেমের গল্প নিয়ে রচিত এটিই একমাত্র কালজয়ী উপন্যাস, যার রচয়িতা আমিনুল ইসলাম।
তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়া থেকে মাস্টার অফ ল(এলএলএম) সম্পন্ন করে আইন প্রশাসয় যুক্ত না হয়ে সাহিত্য, বিনোদন জগত ও সাংবাদিকতা।দেশ ও মানুষের স্বার্থে নিজের প্রতিষ্ঠিত নিরাপদ জীবন গড়ি'র মাধ্যমে নিজ উদ্যোগে ও তার শুভাকাঙ্ক্ষীদেরকে সাথে নিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।১৯ বছর তিনি এক বেলা কম খেয়ে সে খাবারটা মানুষকে খাওয়ান।
সংস্কৃতি অঙ্গনে তিনি "এ প্রজন্মের মরমি" হিসেবে সুপরিচিত। কথায় কথায় গান ও কবিতা রচনার এক বিপুল ঐশ্বরিক শক্তি রয়েছে তাঁর মাঝে। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ২০০০ গান, ১৫০০ কবিতা এবং ৫০০টি মননশীল ছোটগল্প রচনা করে বাংলার সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।
কঠোর জীবনযুদ্ধের কারণে একসময় নাট্য ও সিনেমা জগতে পুরোপুরি স্থায়ী হতে না পারলেও, আমিনুল ইসলাম থিতু হন সাংবাদিকতায়। ২০১১ সালে পারিবারিক পত্রিকা ‘দৈনিক পিরোজপুরের কথা’ দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতার সূচনা। এরপর লায়ন মাহফুজুর রহমানের হাত ধরে ‘দৈনিক ভোরের সময়’ এর নিজস্ব প্রতিবেদক হিসেবে জাতীয় পত্রিকায় তাঁর পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি দৈনিক গণজাগরণ, মুক্তখবর, অপরাধ অনুসন্ধান, মুসলিম টাইমস, সংবাদ, ভোরের পাতা, বাংলার ডাক, আমাদের কণ্ঠ, সকালের সময়,বাংলাদেশের আলো,সর্বশেষ স্যাটেলাইট চ্যানেল চ্যানেল এস এবং প্রেজেন্ট টাইমস-সহ মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে বিভিন্ন বিটে কাজ করেছেন। সমাজকে আলোর পথ দেখাতে গিয়ে পেশাগত দায়িত্বে তিনি একাধিকবার নৃশংস হামলার শিকার হয়েছেন, কিন্তু সত্যের পথ থেকে দমে যাননি।
সাংবাদিকদের অধিকার আদায়ে তিনি সর্বদা সোচ্চার। তিনি বিআরএস-এর সাংগঠনিক সম্পাদক, বাংলাদেশ ম্যাগাজিন কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ রিপোর্টার্স সোসাইটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি মুক্ত গণমাধ্যম সোসাইটি (এফএমএস) এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, সাংবাদিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ (জেআরআরসি) এর প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব এবং ‘নিরাপদ জীবন গড়ি’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা।
একই সাথে তিনি আইন সহায়তা কেন্দ্র, বাংলাদেশ কনজুমার রাইটস এবং ইন্টারন্যাশনাল ডায়ালগ এইড ফাউন্ডেশনে মানবাধিকার বাস্তবায়নে একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন।নিজেকে সাধারণ মানুষের কাতারে রাখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।আজও অসুস্থতা নিয়ে নিরবে মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।তবে তার একটি কথা আমারে নিয়ে কারো কাছে কোন চাওয়া পাওয়া নাই। জীবনযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হয়েও যিনি কলমকে বন্ধু করে সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে শামিল রয়েছেন, সেই কলম শ্রমিক আমিনুল ইসলামের জন্মদিনে রইলো গভীর শুভেচ্ছা ও শুভকামনা। প্রজন্মের কিংবদন্তি এই গুণী মানুষটির রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রাপ্য বলে মনে করি।